সেদিন জয়নাগাছা গ্রামে গিয়েছিলাম পীরেন স্নালের ছেলেমেয়ের খোঁজে, বাড়ির খোঁজে, তৎক্ষণাৎ চিন্তা করলাম, বেদুরিয়া গ্রামে গেলে কেমন হয়। যেই ভাবা সেই কাজ! বেদুরিয়া গ্রামে গিয়েই দেখি “আমানি জু’মাং তাঁত” খুব জোরেসরেই কাজ চলছে, গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কিসের কাজ চলছে? বললো,”চারটি উত্তরীয় অর্ডার আছে “। মনে মনে ভাবলাম, বাহ বেশ তো, তাহলে ভালোই চলছে।

“আপসানের “কর্ণধার মুনমুন নকরেক সিলখ্রিং দ্বারা পরিচালিত এবং উনার ছোট বোন নিঝুম নকরেক দেখাশুনার দায়িত্বে আছেন ও নিজেদের মায়ের জন্য উৎর্গকৃত এই “আমানি জু’মাং তাঁত” কুটির শিল্প। এই তাঁত ঘরে আপাতোত দুজন গারো মেয়ে কাজ করছে।জানা মতে, ট্রেনিং অবস্থায় উনাদের চলার মতো প্রাথমিক অবস্থায় তিন হাজার টাকা করে দিবে, ট্রেনিং শেষ হলে টাকার পরিমাণ আরো বাড়বে।
নিঝুম নকরেকের সাথে অনেক কথা হলো, কথা ফাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কোথা থেকে শিখেছেন, কত টাকা লেগেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। দিদি বলতে লাগলো, তুলি চিসিম, সুমনা চিসি(মাসি) এর মাধ্যমে আসকি পাড়া থেকে শিখে এসেছে, চার মাসে শিখার জন্য ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই বছরের মার্চ মাস থেকে শুরু করে আগস্টের ৮ তারিখ পর্যন্ত শিখে এসেছে। শেখার মধ্যে ছিল, গান্না, উত্তরী বাতরেং, কুটুপ প্রভৃতি। তাঁত ঘর থেকে ঘুরে এসে, মুনমুন নকরেক (দিদি) এর সাথে ফেইবুকে যোগাযোগে করি। উনার সাথে কথোপকথনে অনেক কিছু উঠে।

জাডিল মৃ- কাদের অনুপ্রেরণায় এই কাজগুলো করছেন?
মুনমুন নকরেক – উদ্যোক্তা হওয়ার অনুপ্রেরণা নকরেক আইটির। আর এখান থেকেই আপসান এর পথচলা এবং সেখান থেকেই তাঁত নিয়ে কাজ করার আগ্রহ। তাঁতের কাজে হাত দেওয়া মূলত নিজের একটা তাগিদ থেকেই।
জাডিল মৃ-এই কাজ কত দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে চান?
মুনমুন নকরেক-তাঁত নিয়ে আমার পরিকল্পনার অন্ত নেই। আমি তাঁতকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই ও যুগযুগ ধরে যাতে এই শিল্পটা বেঁচে থাকে তার জন্যে কাজ করার চেষ্টা করছি ও করবো।
জাডিল মৃ- ভবিষ্যতে কী কী করার পরিকল্পনা আছে?
মুনমুন নকরেক-তাঁতে পোশাক ছাড়াও আরও অনেক ধরনের পণ্য বা জিনিস তৈরি করা হবে। এছাড়াও ভবিষ্যতে দকমান্দা তৈরিরও প্লান আছে। ছেলে ও মেয়েদের এবং পাশাপাশি অন্যান্য জাতির পোশাক নিয়েও কাজ করার স্বপ্ন আছে।
জাডিল মৃ– আপনি কতজনের জন্য কর্মস্থান করতে চান?
মুনমুন নকরেক -তাঁত মূলত ঐতিহ্যবাহী পোশাক সংরক্ষণের পাশাপাশি নারীদের কথা ভেবেই গড়ে তোলা। ব্যবসা লাভের উদ্দেশ্যে নয় বরং এর দ্বারা অসহায় ও উপায়হীন নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে গড়ে তোলা। আমি চাই ঘরে ঘরে তাঁত হোক কিন্তু কর্মসংস্থান যদি বলেন আমি বলবো হাজারও অসহায় নারীর জন্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে আমি সৌভাগ্য মনে করবো নিজেকে।

জাডিল মৃ- আমানি জু’মাং তাঁতের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কী?
মুনমুন নকরেক–আমানি জুমাং তাঁতঘর এর একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল আমাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ও পোশাককে বাঁচিয়ে রাখা। নিজেদের জাতির মাঝে এর গুরুত্ব তোলে ধরা সেই সাথে পুরো বিশ্বের কাছে নিজের সংস্কৃতিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এবং এর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
জাডিল মৃ- “আমানি জু’মাং তাঁত ” ক্রেতাদের জন্য নতুন কী কী উপহার দিবে?
মুনমুন নকরেক – আমানি জুমাং তাঁত ক্রেতাদের সবসময় নতুন কিছু উপহার দিতে চায়। সেটা সময়ের সাথে সাথে আমরা চেষ্টা করে যাবো। শুধু পোশাক নয় এছাড়াও অনেকগুলো পণ্য থাকবে তাঁতের তৈরি কাপড়ে কিন্তু নিজস্ব ডিজাইন অবশ্যই প্রাধান্য পাবে।
মুনমুন দিদি আরো বলেন, “দিন মজুরি ৩০০*৩০ হলে ৯০০০ হাজার।কিন্তু সেখানে ১৫/২০দিন কাজ করার সুযোগ পায়। সে হিসেবে এখানে প্রতিদিন একদিন রবিবারে ছুটি। সেই হিসেবে তাদের বেতন দিবো তবে প্রোডাকশন অনুসারে হবে। যেমন একটা গান্নার মূল্য ৫০০ হলে ১০০, ১০০০হলে ২০০, ১৫০০ হলে ২৫০,২০০০ হলে ৩০০ টাকা হবে তাদের পারিশ্রমিক” ।

“আপসান”আচিক পণ্যের জনপ্রিতা ও চাহিদার কথা ইতিমধ্যেই আমরা সবাই জানি, উনারা যে পরিকল্পনা এবং বাস্তাবায়ন করে চলছেন, অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। ইতোমধ্যে উনারা উদ্যোক্তা হিসাবে নিজের জায়গা মজবুত করে চলছেন, তার পাশাপাশি কর্মস্থান সৃষ্টি করছেন। এমনি করে যদি আরো উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়, তাহলে আমাদের জাতির জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের এবং আমাদের অর্থনীতির ভিতও মজবুত হবে।
: ফ
জাদিল মৃ : তরুণ লেখক ও ব্লগার