মসজিদে ‘আল আকসা’ সম্পর্কে কিছু তথ্য

মসজিদে আল আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস বলেও অনেকের কাছে পরিচিত । এটি হলো ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ। জেরুজালেমের পুরনো শহরে এর অবস্থান।

> মক্কার মসজিদে হারামের পরেই পবিত্র কোরআনে যে মসজিদটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি হলো মসজিদে আল আকসা।
 
এটিই সে স্থান, যেখান থেকে রাসূল (সা.) মেরাজের রাতে ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেছিলেন। কোরআনুল কারিমের সূরা ইসরার প্রথম আয়াতে বলা হয়েছে-

‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’

> তিনটি পবিত্রতম মসজিদের মধ্যে এটি অন্যতম। রাসূল (সা.) মসজিদে আকসায় ভ্রমণের জন্য মুসলমানদের উৎসাহিত করেছেন। রাসূল (সা.) বলেছেন,‘তিনটি মসজিদ ছাড়া আর কোথাও জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করো না। মসজিদ তিনটি হলো মসজিদে হারাম, মসজিদে নববী এবং মসজিদে আকসা।’ (সহীহ বুখারী)

> মসজিদে আকসা পৃথিবীতে নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ। পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের চল্লিশ বছর পর এটি নির্মিত হয়। হজরত আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে এ সম্পর্কে জানা যায়। তিনি একবার রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, পৃথিবীর বুকে প্রথম মসজিদ কোনটি?

রাসূল (সা.) উত্তরে মসজিদে হারামের কথা উল্লেখ করেন। এরপর তিনি রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন এর পরে নির্মিত মসজিদ কোনটি। রাসূল (সা.) উত্তরে মসজিদ আল-আকসার কথা বলেন। মসজিদ দুইটির নির্মাণের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান জানতে চাইলে রাসূল (সা.) জবাবে বলেন, এদের মধ্যে ব্যবধান চল্লিশ বছরের।

> পবিত্র কাবার দিকে নামাজের কেবলা নির্ধারিত হওয়ার পূর্বে নামাজের জন্য মুসলমানদের কেবলা হিসেবে মসজিদে আকসা নির্ধারিত ছিলো।

> মিরাজের রাতে রাসূল (সা.) সকল নবী-রাসূলকে নিয়ে আল-আকসা মসজিদে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেছিলেন। রাসূল (সা.) এর ইমামতিতে এই নামাজ আদায় করা হয়।

এই মসজিদের এক রাকাত নামাজ পঞ্চাশ হাজার রাকাত নামাজের সমান। রাসূল (সা.) এর এক হাদীসে বলা হয়েছে- ‘একজন ব্যক্তির তার নিজ ঘরে আদায় করা নামাজের পুরস্কার ওই নামাজের সমান, নিকটস্থ মসজিদে নামাজের পুরস্কার পঁচিশ গুণ, জুমা মসজিদের নামাজ পাঁচশত গুণ, আল- আকসা মসজিদে পঞ্চাশ হাজার গুণ, মসজিদ নববীতে পঞ্চাশ হাজার গুণ এবং মসজিদ আল-হারামে এক লক্ষ গুণ পুরষ্কার রয়েছে।’ (ইবনে মায্হা)

> ৬৩৭ ঈসায়ীতে হজরত ওমর (রা.) জেরুজালেম জয় করার পর রোমানদের ধ্বংসস্তুপ থেকে মসজিদটি পুনঃনির্মাণ করেন।

১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের হাত থেকে পুনরায় মসজিদটি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী মসজিদটি উদ্ধার করেন এবং ক্রুসেডারদের আবর্জনা থেকে তিনি এই মসজিদ আবাদ করেন।

২ কোটি’র মাইলফলক অতিক্রম করল ‘লোকাল বাস’

ইউটিউবে প্রকাশিত ‘বন্ধু তুই লোকাল বাস’ গানটি ২ কোটি ভিউয়ের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এর আগে প্রকাশের ১ সপ্তাহের মধ্যে ১০ লাখ ভিউসের মাইলফলক অতিক্রম করে গানটি দেশিয় সংগীত ইতিহাসে নতুন এক রেকর্ড তৈরি করে।

২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর গানচিল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ পাওয়ার পর তুমুল সাড়া ফেলেছিল গানটি।

গানটির কথা লিখেছেন গোলাম রাব্বানী ও লুৎফর হাসান।সুর করেছেন করেছেন লুৎফর হাসান, সংগীতায়োজনে ছিলেন প্রিতম হাসান। কণ্ঠ দিয়েছেন মমতাজ।

গানটির এমন সফলতায় গানটির গীতিকার গোলাম রাব্বানী বলেন, আমি ইচ্ছা করলেই এক জীবনে দুই কোটি মানুষের ঘরে যেতে পারব না স্বশরীরে। কিন্তু এই গানের মাধ্যমে তা সম্ভব হয়েছে। আমার সৃষ্টি আমাকে দুই কোটি মানুষের কাছে নিয়ে গেছে। তবে বাস্তবে গানটি আরও বেশি মানুষের কাছে গেছে। ভিনদেশি মানুষকেও আমি আনন্দ নিয়ে গাইতে শুনেছি ‘বন্ধু তুই লোকাল বাস’।

গানটির মিউজিক ভিডিওর মডলে হয়েছিলেন মুমতাহিনা টয়া, সৌমিক, প্রীতম হাসান, সংগীত পরিচালক অদিত ও শাফায়াত হোসেন।

https://www.youtube.com/watch?v=p537fHTnW8s বন্ধু তুই লোকাল বাস

কমলগঞ্জে ৩ দিনব্যাপী ফলদ বৃক্ষমেলা শুরু

‘পরিকল্পিত ফল চাষ, যোগাবে পুষ্টিসম্মত খাবার’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ফলদ বৃক্ষমেলা-২০১৯ উদ্বোধন করা হয়েছে।

সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) বেলা ২টায় কৃষি অফিস চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিতা কেটে তিন দিনব্যাপী ফলদ বৃক্ষমেলার শুভ উদ্বোধন করা হয়।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশেকুল হকের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারি অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুস শহীদ এমপি।

উপজেলা স্কাউট সম্পাদক মোশাহিদ আলীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম মোসাদ্দেক আহমদ মানিক, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিছুজ্জামান, উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান বিলকিস বেগম,পরিদর্শক (তদন্ত) সুদিন চন্দ্র দাশ, রহিমপুর ইউপির চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ বদরুল, কাউন্সিলর মো. আনোয়ার হোসেন, প্রেসক্লাব সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।

কমলগঞ্জে তিনদিনের ফলদ বৃক্ষ মেলায় দেশীয় নানান ফল ও ফলদ বৃক্ষের চারার ১২টি স্টল বসেছে। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত কৃষকদের মাঝে একটি করে দেশীয় ফলদ বৃক্ষের চারা বিতরণ করা হয়েছে।

মৌলভীবাজারের ডলি কানাডায় বিরোধী দলীয় ডেপুটি হুইপ

মণিপুরি মুসলিম বিডি :

কানাডার অন্টারিওর প্রাদেশিক সংসদে বিরোধী দলীয় ডেপুটি হুইপ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপিপি (মেম্বার অব প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্ট) ডলি বেগম। তিনি প্রাদেশিক পরিষদে অফিসিয়াল বিরোধী দল এনডিপির ‘আর্লি লানিং অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার ক্রিটিক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে তিনি বিরোধী দলীয় ডেপুটি হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

কানাডায় এই প্রথম কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনৈতিক এই ধরনের দায়িত্ব পেলেন। ডলি বেগমই প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম জনপ্রতিনিধি হওয়ার ইতিহাস গড়েছিলেন।

কনজারভেটিভ প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের গণবিরোধী নানা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে খোলামেলো বক্তব্য রেখে ডলি বেগম ইতিমধ্যে অন্টারিওর প্রভিন্সিয়াল রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন। অন্টারিওর পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন ডলি বেগম।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের বাজরাকোনা গ্রামের সন্তান ডলি বেগম। তার দাদা মো. সুজন মিয়া ছিলেন মনুরমুখ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান।

হিজবুল্লার হামলায় ইসরাইলী সেনা কমান্ডার নিহত!

মণিপুরি মুসলিম বিডি | আন্তর্জাতিক ডেক্স


ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের উত্তর সীমান্তের একটি সামরিক ঘাঁটিতে লেবাননের হিজবুল্লা যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তাতে ইসরাইলের নর্দান ডিভিশনের কমান্ডার নিহত হয়েছেন।

লেবাননের আল-মানার টেলিভিশন চ্যানেলের খবরে ইসরাইলের পক্ষ থেকে এমন ইঙ্গিত তুলে ধরা হয়েছে।

হতাহত সেনাদের হেলিকপ্টারে করে জিফ হাসপাতালে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। সীমান্তের হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

ইরানের প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, হিজবুল্লার হামলায় ইসরাইলের একটি ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। এর আগে হিজবুল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলের একটি সামরিক যান ধ্বংস এবং কয়েকজন ইহুদি সেনা হতাহত হয়। ইসরাইলী সেনা হতাহত হওয়ার ব্যাপারে খবর প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তেল আবিব।

ইসরাইলে এরইমধ্যে দক্ষিণ লেবাননের অভ্যন্তরে ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এছাড়া, ইসরাইলি সেনারা ফসফরাস বোমা ব্যবহার করছে। সীমান্তের চার কিলোমিটারের মধ্যকার ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদেরকে ঘর-বাড়ি ও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সেখানকার জনগণের মধ্যে ব্যাপক ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি- মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং ফরাসি প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ইমানুয়েল বনের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেছেন। টেলিফোন আলাপে সাদ হারিরি চলমান পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও হস্তক্ষেপ করার জন্য আমেরিকা ও ফ্রান্সের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গত সপ্তাহে ইসরাইলি ড্রোন হামলার পর হিজবুল্লা নেতা সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রতিশোধমূলক হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর লেবাননের শেবা কৃষি খামার সংলগ্ন সীমান্তে ইসরাইল সেনা সমাবেশ জোরদার করে।

শনিবার রাতে এক টেলিভিশন ভাষণে হিজবুল্লা মহাসচিব হাসান নাসরুল্লাহ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাজধানী বৈরুতে সাম্প্রতিক ইসরাইলি ড্রোন হামলার জবাব দেয়ার যে সিদ্ধান্ত তার সংগঠন নিয়েছে তার কোনো নড়চড় হবে না। তিনি বলেন, গত সপ্তাহের ড্রোন হামলার জন্য ইসরাইলকে ‘মূল্য পরিশোধ করতে হবে’।

সূত্র : পার্সটুডে

ভালোবেসে শাড়ি পরি, কারও মনোরঞ্জনের জন্য নয়

রাজনীন ফারজানা

শিক্ষক বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শাড়ি বিষয়ক একটি লেখা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এই লেখায় বাঙালি মেয়েদের পোশাক হিসেবে শাড়িকে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

new bkash app

শাড়ি পরার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে নারীর শরীর নিয়ে নানাবিধ উপমা ব্যবহার করেছন, যা নারীকে হেয় করেছে বলেই মনে করছেন অনেকে। লেখাটিতে তিনি বাঙালি নারীদের চেহারার কথা বলতে গিয়ে তাদের উচ্চতা, চেহারা ও শারীরিক আকৃতি নিয়েও কটাক্ষ করেছেন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবু সায়ীদ একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। যুগের পর যুগ ধরে দেশের আনাচে-কানাচে বই পড়া আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি আলোকিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ও সম্মানিত। এমন একজন মানুষের লেখায় নারী শরীরের আকৃতি, মানুষের চেহারা ও পোশাকের রুচি নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য অনেকেই আশা করেননি।

আবহমানকাল জুড়েই বাঙালি নারী শাড়িতে অভ্যস্ত। দেশের সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রীসভার নারী সদস্য, বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ প্রথিতযশা প্রায় সব বাঙালি নারীকেই দেখা যায় দেশে-বিদেশে শাড়ি পরতে। সময়ের সঙ্গে অন্যান্য অনেক পোশাক পরলেও এখনো শাড়িই বাংলাদেশের জাতীয় পোশাক।বিজ্ঞাপন

সবার প্রিয় সেই পোশাক নিয়ে আবু সায়ীদের বিতর্কিত মন্তব্য বিষয়ে পক্ষ মতামত জানতে চাওয়া হয় কয়েকজন বিশিষ্ট নারীর কাছে।

সাদেকা হালিম

ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সাদেকা হালিম বলেন, ‘আমি বাঙালি তাই শাড়ি পরি। বাসায় অনেকসময় শাড়ি পরলেও বাইরে কোথাও গেলে শাড়ি ছাড়া অন্য পোশাকের কথা ভাবতেও পারি না। এভাবেই শাড়ির সঙ্গে আমার আমিত্ব মিশে গেছে। যেকোন পরিস্থিতিতে শাড়ি পরতে কোনো অসুবিধা হয় না। শাড়ি পরে সাইকেলও চালাতে পারি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, একজন ব্যক্তির জতীয়তাবোধ প্রকাশের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো তার পোশাক। দেশীয় পোশাক হিসেবে তাই দেশে-বিদেশে সব জায়গায় আমি শাড়ি পরি।’

যুগ যুগ ধরে মা, খালা, চাচি, ফুপু, দাদি, নানি কিংবা তারও আগের প্রজন্মের নারীরা শাড়িই পরতেন। সাদেকা হালিম এ বিষয়ে বলেন, ‘পরিবারের বিভিন্ন বয়সী নারীকে শাড়ি পরতে দেখেছি তাই আমিও শাড়িই পরি। এটাই আমার পোশাক।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভ্যাস করলে দ্রুত শাড়ি পরা কোনো জটিল বিষয় না। অন্তত ৫০ ভাবে শাড়ি পরা যায়। তাই যার যেমন সুবিধা সেভাবে শাড়ি পরলেই হয়।’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মন্তব্য বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উনার মতো একজন ব্যক্তির কাছ থেকে শাড়ি বিষয়ক এমন মন্তব্য প্রত্যাশিত না। তিনি নারীকে মানুষ হিসেবে না দেখে পণ্য হিসেবে দেখেছেন।’

এই বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘নারী কিংবা পুরুষ কারোরই পোশাক নির্ধারণ করে দেওয়া অনুচিত।’

সাদিয়া নাসরিন

নারীবাদী লেখক ও অ্যাকটিভিস্ট

নিয়মিত শাড়ি পরেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি শাড়ি পরে করি না এমন কোনো কাজ নেই।’ গাড়ি চালানো, অফিস করা, ব্যাকপ্যাক পিঠে ঝুলিয়ে বাইরের কাজ করা, ঘরের কাজ সবই করেন বলে জানান তিনি। সাদিয়া বলেন, ‘এটাই আমার পোশাক। এতেই আমি আরাম পাই।’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মতো আলোকিত একজন মানুষের কাছ থেকে শাড়ি বিষয়ক এমন মন্তব্য আশা করেননি বলে জানান তিনি। সাদিয়া নাসরিন বলেন, ‘বই পড়ার সুযোগ করে দিয়ে কয়েক প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব গড়েছেন যিনি শাড়ি নিয়ে তার লেখাটিও আমি বুঝিনি। সেটা কি আসলে সাহিত্য নাকি মুক্ত গদ্য তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়।’

সাদিয়া বলেন, ‘আবু সায়ীদ আমাদের কাছে একজন আইকনিক ব্যক্তিত্ব। অথচ শাড়ি বিষয়ে তিনি যেভাবে নারীর চেহারা, উচ্চতা, শারীরিক আকৃতি এবং যৌনতার উল্লেখ করেছেন তাতে এই লেখাটিকে সেক্সিস্ট (যৌন বৈষম্যমূলক) ও রেসিস্ট (বর্ণবাদী) বলে মনে হয়েছে।’

সাদিয়া নাসরিন আরও বলেন, ‘তিনি শাড়িকে উত্তেজক পোশাক হিসেবে লিখে মূলত নারীকেই পণ্যায়ন করেছেন। যেখানে আমরা সবাই মিলে ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়ার আন্দোলন করছি, সেখানে ওনার এই ধরনের অবিবেচক মন্তব্য সমাজের ধর্ষকামী আচরণকে আরও উসকে দিতে পারে বলে মনে করি আমি।’

সাদিয়া বলেন, ‘একই লেখায় তিনি বলেছেন বাঙালি নারী-পুরুষ তার নিজস্ব সৌন্দর্যের মাপকাঠি অনুযায়ী যথেষ্ট সুন্দর না। গড়পরতা বাঙালি চেহারা নিয়ে এমন অনভিপ্রেত মন্তব্য মোটেই তার কাছ থেকে কাম্য না।’

‘তিনি শুধু নারীর পণ্যায়ন করেই থেমে থাকেননি, মেয়েদের ঘরের বাইরে কাজ করা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন বলেই মনে হল’—বলেন সাদিয়া নাসরিন।

এমনকি নারী কী পরবে না পরবে, সেটারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার এমন মন্তব্য ধর্ষকামীদের পাশাপাশি মৌলবাদীদেরও উসকে দিতে পারে সেই আশঙ্কাও জানান এই লেখিকা।

মাসুদা ভাট্টি

সাংবাদিক

এই প্রসঙ্গে মাসুদা ভাট্টি বলেন, ‘শাড়ি নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখাটা ভালো হলেও বিষয়বস্তু ভালো লাগেনি তার। লেখাটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন বাঙালি নারীরা খুঁত ঢাকার জন্য শাড়ি পরে।’

শাড়ি তার কাছে একটি আরামদায়ক পোশাক। এই পোশাক নিয়ে তিনি বলেন, ‘শাড়ি একটা পোশাক যা মেয়েরা ভালোবেসেই পরে। আমি নিজেও শাড়ি পরি। অনেকেই আছে কাজের সুবিধার জন্য শাড়ি পরেন কম। অন্যান্য পোশাক পরেন। কে কী পরবেন সেটা নির্ধারণ করে দেওয়ার চেষ্টা খুবই কুৎসিত চিন্তার প্রকাশ।’

‘আবু সায়ীদের পর্যায়ের একজন বুদ্ধিজীবীর মুখে এমন সেক্সিস্ট আর রেসিস্ট কথা মানায় না। যেখানে উনার মতো মানুষের লেখায় আরও দশটা মানুষের আলোকিত হওয়ার কথা। অথচ এই লেখা পড়ে মনে হল না কোনো বুদ্ধিজীবীর নয়, একজন পুরুষতান্ত্রিক পুরুষের লেখা পড়ছি’—বলেন মাসুদা ভাট্টি।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘যে বাতিঘর থেকে আলো বের হওয়ার কথা ছিল সেখানে থেকে বের হলো ভয়াবহ অন্ধকার। সেই বাতিঘর এখন বল্লরী, রমণী, বাঁক, খাঁজ, উঁচু-নিচু নিয়ে ভাবিত তা সত্যিই বিস্ময়ের! বেচারি নিরীহ শাড়ির কথা বলতে গিয়ে আমরা শুনে ফেলেছি শাড়ির আবরণে লুকোনো কুৎসিৎ পুরুষ-চিন্তা! পৃথিবী কত এগোলো বাতিঘরের আলোর অপেক্ষা না করেই—এটাই আজকের দিনের আনন্দবার্তা।’

কাবেরী গায়েন

চেয়ারপার্সন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

‘আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ শাড়ির কথা লিখতে গিয়ে যেভাবে বাংলাদেশি নারীর চেহারা, উচ্চতা, শারীরিক গঠন নিয়ে, মন্তব্য করেছেন তা রীতিমতো বডি শেমিং (শরীরের গঠন নিয়ে লজ্জা দেওয়া)’— বলেন কাবেরী গায়েন।

এছাড়া আবু সায়ীদের এই লেখার জন্য তার এখন নিশঃর্তভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক আবু সায়ীদের লেখার প্রসঙ্গ টেনে কাবেরী গায়েন বলেন, ‘তিনি বলেছেন, বাঙালি নারীকে শাড়ি ছাড়া আর কোনো পোশাকে সুন্দর লাগে না। বাঙালি নারীর চেহারা নিয়ে এমন কটাক্ষ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক।’

কাবেরী গায়েন বলেন, ‘শাড়ি মেয়েরা ভালবেসে পরে, পুরুষের মনোরঞ্জন বা অন্যের চোখে আকর্ষণীয় দেখাতে পরে না। এটি একটি পোশাক, উত্তেজক পোশাক নয়। একজন নারী কিংবা একজন পুরুষ কী পোশাক পরবেন তা কেউ নির্ধারণ করে দিতে পারেন না। উনার মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কাছ থেকে এমন মন্তব্য ও ভাষা তাই মেনে নেওয়া যায় না।’

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর ১০১তম জন্মবার্ষিকী

মণিপুরি মুসলিম বিডি | বিশেষ প্রতিবেদন


যুগে যুগে দেশে দেশে জন্ম গ্রহণ করে কিছু ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। আবার কিছু ব্যতিক্রমী মানুষও আছেন যারা আজীবন নিঃশব্দে তিল তিল করে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে গেছেন। নিজের সুখ, শান্তি, আরাম, আয়েসের জন্য সামান্য চিন্তাও করেননি তারা।

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি তার জীবন কর্মকালীন সময় এবং চিন্তা ভাবনা দেশ ও জাতির জন্য বিলিয়ে দিয়ে হয়েছেন এই সর্বত্যাগী মহান বীরপুরুষ। যাঁর নামটি বাদ দিলে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস পুরোটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে এবং স্বাধীন হওয়ার পর, এমনকি উপমহাদেশ বিভাগের পূর্বেও, রাষ্ট্রের কঠিন দুঃসময়ে মানুষটিকে পেয়েছি দেশের স্বার্থে নিয়োজিত অবস্থায়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বিলিয়ে দিয়েছেন এই প্রিয় দেশটিকে, বিয়েও করেননি, রয়েছেন চিরকুমার। আজ এই মহান ব্যাক্তির ১০১তম জন্মদিন।


জন্ম : ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে তাঁর জন্ম। বাবা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান, মা জুবেদা খাতুন। বাবার কর্মস্থল ছিল সুনামগঞ্জ। পৈতৃক নিবাস অবশ্য সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার দয়ামীরে। ওসমানী ছিলেন দয়ামীরের শাহ্ নিজামুদ্দিন ওসমানীর বংশধর। ধারণা করা হয় যে, হজরত শাহজালাল রহ. যখন সিলেটে আসেন ১৩০৩ সালে, তখন যে ৩৬০জন আউলিয়া তাঁর সাথে এসেছিলেন, তন্মধ্যে অন্যতম ছিলেন শাহ্ নিজামুদ্দিন ওসমানী।

ওসমানীর পিতা মরহুম খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর একজন উচ্চ শিক্ষিত। তিনি ছিলেন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট ও বেঙ্গল -আ্সাম সিভিল সার্ভিসের হতে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের লিষ্টেড পদে উন্নীত হন। ১৯৩১ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট-্এর চাকুরী নিয়ে এক সময় আসামের জেলা প্রশাসক হয়েছিলেন। চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের সময় তিনি ছিলেন আসামের ল্যান্ড রেকর্ডস এর ডাইরেক্টার। সিলেট তখন আসাম প্রদেশ এর অন্তভর্’ক্ত ছিল। ১৯৫৬ সালে ওসমানীর পিতা হজব্র্রত পালন করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করলে তাঁকে মক্কার আরাফাতের ‘জবলে রহমত’ নামক সুউচ্চ পাহাড়ে কবর দেওয়া হয়।

দুই ভাই আর এক বোনের মাঝে ওসমানী ছিলেন সবার ছোট। বাল্যকালে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘আতা’। ‘বঙ্গবীর’ নামেই অধিক পরিচিত। পাকিস্তান আর্মিতেও কিন্তু তাঁর একটা পরিচিত নাম ছিল; ‘Papa Tiger’।

শিক্ষাজীবন : কোনো স্কুলে ভর্তি না হয়ে, ঘরে বসে বসেই তাঁর বিদুষী মায়ের অনুশাসন এবং যোগ্য গৃহশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বাংলা ও ফার্সি ভাষায় ওসমানী প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১৯২৯ সালে ১১ বছর বয়সে ওসমানীকে আসামের গৌহাটির কটনস স্কুলে ভর্তি করা হয়। কটন স্কুলে পড়াশুনা শেষ করার পর মায়ের ইচ্ছায় ১৯৩২ সালে সিলেট সরকারী পাইলট স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয়। ১৯৩৪ সালে সিলেট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে। সমগ্র বৃটিশ ভারতে তিনি প্রথম হন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে প্রিটোরিয়া পুরস্কার প্রদান করেছিল। সমগ্র ভারত উপমহাদেশে ইংরেজি বিষয়ে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির জন্য প্রিটোরিয়া অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। ১৯৩৪ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি ১৯৩৬ সালে আই.এ পাশ করেন। ১৯৩৮ সালে বি.এ পাশ করেন এবং ১৯৩৯ সালে ভূগোলে এম এ প্রথম পর্ব পড়ার সময় বৃটিশ-ভারতীয় সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৩৯ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেন তিনি।

ওসমানীর বাবা ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভেন্ট, তাই তিনিও চেয়েছিলেন সেই সময়ের এত সম্মানীত পেশায় পিতার পথেই হাঁটবে পুত্র। কিন্তু ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পাশ করা ওসমানী সিদ্ধান্ত নিলেন সৈনিকের জীবনকেই বেছে নিবেন তিনি।  ধারণা করা হয় যে, সমগ্র জীবনে শুধু মাত্র এই একবারই ওসমানী তাঁর বাবার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তিনি ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সার্ভিসের জন্য সিলেক্ট হয়েও এই রাজকীয় এক জীবনকে পেছনে ফেলে বেছে নেন একজন সৈনিকের কঠোর জীবন। এই হলেন আমাদের ওসমানী।

ওসমানী যখন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে যান, ইন্টারভিউতে একজন বোর্ড মেম্বার প্রশ্ন করেছিল, আপনি কি মনে করেন, আপনার উচ্চতা একজন সৈনিকের জন্য যথোপযুক্ত? বলাবাহুল্য যে, ওসমানীর উচ্চতা খানিক কমই ছিল, তিনি এই প্রশ্নের জবাবে বলেন যে, যদি হিটলারের মতো মানুষ এই পুরো পৃথিবী নাড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে আমি কেন পারব না? বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নির্ধারণ কমিটির সকলেই ওসমানীর আচরণে অভিভূত হয়ে যায়, সেই বছরেই জুলাই মাসে সিভিল সার্ভিসের যোগদানের সুযোগ বাদ দিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ওসমানী।

কর্মজীবন : ১৯৩৯ সালে তিনি রয়্যাল আর্মড ফোর্সে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। দেরাদুনে ব্রিটিশ ভারতীয় মিলিটারি একাডেমীতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন কমিশন প্রাপ্ত অফিসার হিসেবে। ১৯৪১ সালে ক্যাপ্টেন এবং ১৯৪২ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। তৎকালীন সময়ে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ মেজর। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তিনি এক ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক হয়ে যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বার্মার রণাঙ্গনে স্বতন্ত্র যান্ত্রিক পরিবহনে এক বিশাল বাহিনীর অধিনায়কত্ব দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৫ সালে ওসমানী তাঁর পিতার ইচ্ছা পূরণে আই.সি.এস পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তিনি আত্মনিয়োগ করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনী গঠনে। ১৯৪৭ সালে ৭ অক্টোবর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পি.এস.সি ডিগ্রী লাভ করেন।

১৯৫১ সালে লে. কর্ণেল ওসমানী উদ্যোগী হয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হয়ে পূর্ব বাংলায় আসেন আর আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তিই ছিল ওসমানীর গড়া সেই বেঙ্গল রেজিমেন্ট। বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে পূর্ব বাংলায় এসেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রাম সেনানিবাস।

ওসমানীকে ১৯৫৫ সালে ১২ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সেনা সদর অপারেশন পরিদপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার নিয়োগ করা হয়। এখানে তাঁকে ১৯৫৬ সালে ১৬ মে মাসে কর্ণেল পদে পদোন্নতি প্রদান করে ডেপুটি ডাইরেক্টর এর দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়। এ-সময় আন্তর্জাতিক সংস্থা সিয়াটো ও সেন্টোতে ওসমানী পাকিস্তান বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন।। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে ওসমানীর দক্ষতার সংগে ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনের দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্ণেল পদে কর্মরত থাকাকালীন ওসমানী একজন স্বাধীন চেতা বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি উন্নীত হন কর্ণেল পদে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি প্রথমবারের মতো সামরিক পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

যুদ্ধকালীন সময় : ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকাতেই ছিলেন ওসমানী। পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বছর চারেক আগে অবসর নেয়া ওসমানীর সামরিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতা সম্পর্কে পারিস্তান সরকার অবগত ছিল। তাই ঐ রাতেই ওসমানীকে হত্যার চেষ্টায় হন্যে হয়ে খোঁজে পাকবাহিনীর এক কমান্ডো। কিন্তু একেবারেই ভাগ্যগুণে অনেকটা অলৌকিকভাবে প্রাণ বেঁচে যায় ওসমানীর। এত পরিচিত চেহারা নিয়ে তিনি নিরাপদে পালিয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে মনজুর আহমদ নামক এক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারে এই ব্যাপারে তিনিই খোলাসা করেন, বলেন যে, হানাদার পাকিস্তানী সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে ঢাকা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর বিখ্যাত গোঁফ জোড়াটি কামিয়ে ফেলেছিলেন। ঢাকা থেকে তিনি পালিয়েছিলেন ২৯শে মার্চ। এর আগের চারদিন ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফাঁকা বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। সেনারা তাঁকে খ্যাপা কুকুরের মতো খুঁজছিল। তাঁর ধানমন্ডির বাড়িতে চালিয়েছিল হামলা। প্রতিটি ফাঁকা ঘরেই মেশিনগান চালিয়েছে। নিউ ইস্কাটনের বেশ কয়েকটি বাড়িতেও তারা হামলা চালিয়েছিল, কিন্তু ওসমানী যে বাড়িতে ছিলেন, সেটায় হানা দেয়নি। এ ব্যাপারে ওসমানী উল্লেখ করেন, পরম করুণাময়ের অশেষ অনুগ্রহ ছিল তাঁর ওপর। তা না হলে এমনভাবে কজন রক্ষা পায়! ২৯শে মার্চ, নদীপথে পালিয়ে গিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধরত ব্যাটালিয়নের সাথে যোগ দেন তিনি। শুরু হয় ওসমানীর জীবনের নতুন এক অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পাক-ভারত যুদ্ধের পর এবার শুরু হয় নিজের মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার যুদ্ধ; যা ছিল স্বজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। নিজের সবটুকুই বিলিয়ে দেন তিনি এই যুদ্ধে।

যুদ্ধোত্তর পর্যায় : ১৯৭১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর তাঁকে বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সের জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ওসমানী তাঁর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন দু’ভাবে। আপামর জনসাধারণের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা, আর ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল, ওসমানীকে চার তারকাযুক্ত জেনারেল পদে উন্নীত করা হয়। একই সাথে জেনারেল পদটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ সরকার জেনারেল পদ বিলুপ্ত করে – সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী আর বিমানবাহিনীকে পৃথক করে দেয়। তিন বাহিনীরই পৃথক পৃথক প্রধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

রাজনীতি :  সামরিক বাহিনী থেকে ওসমানী অবসর গ্রহণের পর ১৯৭০ সালেতিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। গড়পরতা মানুষের মতো স্ত্রী সন্তান নিয়ে সৌখিন অবসর জীবন তিনি পাননি। কারণ যুদ্ধ বিগ্রহ আর পেশাগত জীবনে নিজেকে এমনভাবে বিলিয়ে দিয়েছিলেন যে, বিয়ে করার সময় হয়ে ওঠেনি তাঁর। তিনি ভাবতেন, একজন সৈনিককে সৌখিন জীবন মানায় না। রাজনীতিতে নেমেই পেলেন ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনকারী ১৯৭০ এর নির্বাচন। আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সিলেটের চারটি থানা নিয়ে গঠিত উভয় পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ নির্বাচনী এলাকা থেকে জয় লাভ করে তিনি জাতীয় সংসদে আসন লাভ করেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর পাকিস্তানের নাগরিক। অতঃপর ১৯৭১ সালে নিজের নেতৃত্বে সব শত্রু বিতাড়িত করে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন। জীবনের পাঁচ দশক অতিক্রম করা এই বঙ্গবীর কখনোই ভাবেননি যে, স্বাধীন দেশে তাঁর দায়িত্ব শেষ হতে চলেছে। সামরিক বাহিনীতে ছিলেন না, কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তাঁর অনেক দায়িত্ব বেড়ে গেছে, এমনটাই ভাবতেন তিনি।

১৯৭৩ সালে, স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনে ওসমানী ৯৪ শতাংশ ভোটে বিজয়ী হয়ে “ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়-এর দায়িত্ব নেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি যুগপৎ সংসদ সদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগ সদস্য পদ ত্যাগ করেন। সে বছরই ২৯শে আগস্ট রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক আহমদ তাঁকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। কিন্তু ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতার হত্যাকান্ডের অব্যবহিত পরেই তিনি পদত্যাগ করেন।

১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওসমানী জাতীয় জনতা পার্টি নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন।

১৯৭৫ সনের ২৫ জানুয়ারি সংসদীয় গণতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে একদলীয় শাসন ‘বাকশাল’ প্রতিষ্ঠাকালীন ওসমানী তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং বিফল হয়ে সংসদ সদস্য পদ, মন্ত্রীত্ব এবং আওয়ামীলীগ হতে পদত্যাগ করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর স্বপ্ন সংসদীয় গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় জনতা পাটি নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তার রাজনৈতিক মতাদর্শ বিস্তারিতভাবে তিনি গণনীতির রূপ রেখা নামে প্রণীত বইতে লিখেছেন।

সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ, অস্ত্রমুক্ত শিক্ষাঙ্গণ, দুর্নীীতমুক্ত প্রশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকল্প নেই । গণতন্ত্রের বিকল্প হচ্ছে সেনা শাসক। উর্দিপরা সেনা শাসকরা পাকিস্তানে গণতন্ত্র ধ্বংশ করেছে। বাংলাদেশেও যেন এর উদ্ভব না হয়-বলেছেন ওসমানী। একজন সেনা শাসক হয়েও গণতন্ত্রের প্রতি তার এমন অবিচল আস্তা গোটা জাতিকে একটি সুনিদিষ্ট লক্ষ্য ও আর্থসামাজিক নীতির ভিত্তিতে সুসংহত করে নতুন দল গঠন করে হতাশামুক্ত করার জন্য গণতন্ত্রের প্রতি তার আকৃষ্ঠ করেছে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এবং অনেক রক্তের বিনিময়ে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হয়েছে। ইহা ওসমানীরই অবদান। নির্বাচনে হেরে গেলেও এটি তার রাজনৈতিক বিজয়।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য যে চার ধরণের সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিল যোদ্ধাদের, তার প্রাথমিক তালিকা ওসমানী নিজ হাতে তৈরি করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ আনা হয় যে, ওসমানী পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে এই তালিকাটি তৈরি করেছেন। ওই সময়ে তালিকা বাতিল ঘোষণা করা হলেও, পরবর্তীতে এই তালিকা অনুযায়ী বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বীক্রম আর বীর প্রতীক সম্মান ধারীদের নাম ঘোষিত হয়।

ওসমানী জাদুঘর প্রতিষ্ঠা : ১৯৭৬ সালের ১৮ই মে এ বাড়ির ২ বিঘা জায়গা দিয়ে তিনি তাঁর বাবা-মায়ের নামে গঠন করেন জুবেদা খাতুন-খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্ট। এ ট্রাস্টের মাধ্যমে মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে ঢাকার ধানমন্ডির রোড-১০-এ, বাড়ি নং ৪২-এর সুন্দরবন নামক ওসমানীর নিজস্ব বাড়ির সম্পত্তি দিয়ে আর্তমানবতার সেবার লক্ষ্যে গঠন করা হয় ওসমানী ট্রাস্ট।

এরশাদ সরকার ১৯৮৭ সালে সিলেটে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করে। সেই লক্ষ্যে, জুবেদা খাতুন-খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্টের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ৯৯ বছরের জন্য ধোপাদীঘির পাড়ের বাড়িটি লীজ নেয় সরকার। ১৯৮৭ সালে ৪ মার্চ এ বাড়িতে ওসমানী জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সেই থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় জাদুঘরের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে এটি।

তাঁর স্মরণে ঢাকায় গড়ে উঠেছে ওসমানী উদ্যান ও স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশ সচিবালয়ের বিপরীতে ওসমানী মেমোরিয়াল হল। সরকারী উদ্যোগে সিলেট শহরে তাঁর নামে একটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ওসমানী নগর থানার দয়ামীরে ওসমানী স্মৃতি যাদুঘর ও গ্রন্থাগার। বালাগঞ্জ উপজেলাকে ভেঙ্গে যে থানা ঘোষণা করা হয় তাঁরই নামে “ওসমানী নগর থানা”। নামকরণ করা হয়েছে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। সিলেটে বঙ্গবীর রোডসহ অসংখ্য স্বীকৃতি স্থাপন করা হয়েছে।

ইন্তেকাল : ১৯৮৩ সালে ৬৫ বছর বয়সে ওসমানীর ক্যান্সার ধরা পড়লে ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে ১৯৮৪ সালে তাঁকে লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলোমিও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। লন্ডনে অধিকাংশ সময়ই তিনি তার ভাতিজা-ভাতিজীদের সাথে কাটিয়েছেন। ১৬ই ফেব্রুয়ারী তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃতদেহ দেশে নিয়ে এসে সম্পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় সিলেটের দরগাহতে তাঁর মায়ের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়, এই ছিল তাঁর অন্তিম ইচ্ছা।

লুটপাটে ডুবল ৩৮শ কোটি টাকার প্রকল্প

ওয়াসার এই প্রকল্পের কাজ শেষ আট মাস আগে, পানি আসেনি ঢাকায়, পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচ মিনিট পাম্প চালু করতেই ফেটে যায় পাইপ, নিম্নমানের পাইপ ব্যবহারে আপত্তি করায় প্রকল্প পরিচালককে বদলিজয়শ্রী ভাদুড়ী, মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরে

মুন্সীগঞ্জের যশলদিয়া থেকে পদ্মার পানি পরিশোধন করে ঢাকায় সরবরাহের প্রকল্প শেষ হয়েছে আট মাস আগে। কিন্তু এখনো তা চালু হয়নি। সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে একবার চালু করা হলেও পাঁচ মিনিটেই পানির পাইপ ফেটে ভেস্তে গেছে পুরো প্রকল্প। কম পুরুত্বের নিম্নমানের পাইপ ব্যবহারে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।ব্যবহৃত পাইপ বুয়েটে পরীক্ষা করা হয়নি। এভাবেই লুটপাট এবং অনিয়মে ডুবতে বসেছে ওয়াসার ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প।

নিম্নমানের বলে অভিযুক্ত এই ‘কে৯’ পাইপ সরবরাহ না করতে ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়ায় সরিয়ে দেওয়া হয় প্রকল্প পরিচালককে।২০১৪ সালের ৯ অক্টোবর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী এম এ রশীদ সিদ্দিকী। চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে দেওয়া ওই চিঠিতে প্রকল্প পরিচালক লেখেন- ‘ঢাকা ওয়াসার সাথে এই প্রকল্পের চুক্তি অনুযায়ী ‘কে৯’ ডাকটাইল পাইপ গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ঢাকা ওয়াসার অনুমোদন ছাড়া এই পাইপ না পাঠানোর জন্য বলা হচ্ছে। ’ এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান সংস্থার তৎকালীন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজউদ্দিন (গবেষণা, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) এবং প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেমকে অনেকটা ধমক দিয়ে মেইল করেন। বলেন, ‘এসব কী চলছে?’ ২০১৪ সালের ৯ অক্টোবর রাত ৮টা ৫৬ মিনিটে পাঠানো ওই মেইলে তিনি আরও লেখেন, ‘আপনারা কি ওই চিঠি সম্পর্কে অবগত আছেন? প্রকল্প পরিচালক এগুলো কী করছে? তিনি কেন ওই চিঠি আপনার সাথে আলোচনা না করে লিখেছে? তাকে বলে দেন, আর একটা শব্দও যেন আমাকে বা আপনাকে জিজ্ঞেস না করে লেখা হয়।’ তিনি এই মেইলের অনুলিপি দিয়েছিলেন উপ-প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম এবং স্থানীয় ঠিকাদার অ্যারিডড গ্রুপের পরিচালক আজিজুল আকিল ডেভিডকেও।

একইভাবে ওই দিন রাত ৯টা ২৭ মিনিটে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজউদ্দিন প্রকল্প পরিচালক এম এ রশীদ সিদ্দিকীকে মেইল পাঠান। তিনি লেখেন- ‘এরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা না বলে ঠিকাদারকে মেইল পাঠানোয় আমি অবাক হচ্ছি। এটি পুরো প্রক্রিয়াকে জটিলতায় ফেলেছে। আপনাকে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে এবং এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।’ এরপর প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে প্রকৌশলী এম এ রশীদ সিদ্দিকীকে সরিয়ে মো. রফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মাঠ পর্যায়ে এ প্রকল্পের দুর্নীতি আরও দৃশ্যমান। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, পানি পরিশোধন করে পাইপ যশলদিয়া থেকে পদ্মা, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদী পার করে ঢাকা আনতে হবে। তিনটি নদী পারাপারে চুক্তি মোতাবেক ২ দশমিক ৫ মিটার ব্যাসের কেসিং পাইপ বসানোর কথা ছিল। অথচ এক্ষেত্রে কোনো কেসিং পাইপ বসানো হয়নি। নদীর পানি কমে গেলে নৌযানের সঙ্গে মূল পাইপ লেগে যায়। কেসিং পাইপ না দেওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে পুরো প্রকল্প। যশলদিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত পাইপলাইন বসানো হলেও ঢাকায় পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক প্রস্তুত করা হয়নি। ফলে নগরবাসী কবে নাগাদ পদ্মার পানি পাবেন তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। প্রকল্পের ধাপে ধাপেই এই গলদ। রাজধানীর বাবুবাজারের কাছে সায়েদাবাদ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের সরবরাহ নেটওয়ার্ক রয়েছে। এর ব্যাস ৬০০ মিলিমিটার। কিন্তু যশলদিয়া থেকে যে পাইপ ঢাকায় আসছে এর ব্যস ২ হাজার মিলিমিটার। তাই ৬০০ মিলিমিটারের ব্যাসে যশলদিয়া থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় পানি এনে সরবরাহ করা কারিগরিভাবে সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এরকম ধাপে ধাপে লুটপাট অনিয়মে প্রকল্প চালু করতে না পারলেও গত বছরের নভেম্বরেই পরিশোধ করা হয়েছে ঠিকাদারের ৯০ শতাংশ বিল। শুধু পারফরমেন্স গ্যারান্টির (পিজি) ১০ শতাংশ পরিশোধ করা হয়নি। এ প্রকল্পে ঠিকাদারের ১ বছরের ওয়ারেন্টি পিরিয়ডের ৮ মাসই পার হয়েছে। বাকি চার মাসে প্রকল্প চালু না হলেও ঠিকাদারকে এই অর্থও পরিশোধ করতে হবে। পরবর্তীতে প্রকল্পে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি তৈরি হলে ঠিকাদারের কোনো দায়বদ্ধতা থাকবে না।

এ প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে মেসার্স চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। এদের সঙ্গে স্থানীয় ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে অ্যারিডড গ্রুপের পরিচালক আজিজুল আকিল ডেভিড। তবে ডেভিড দাবি করেছেন তিনি স্থানীয় ঠিকাদার নন, চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির কারিগরি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। পাইপের ব্যাপারে আজিজুল আকিল ডেভিড বলেন, ‘ওয়াসা এই পাইপ না নিলে তো আর প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়নি। আর বুয়েটের কি সক্ষমতা আছে এই পাইপ টেস্ট করার?’ প্রকল্প হস্তান্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্প জানুয়ারি মাসে শেষ হয়েছে। এ বছর ওয়ারেন্টি পিরিয়ড রয়েছে। এর পরে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে সে দায় চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নয়। ’

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, পদ্মা (যশলদিয়া) ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের ব্যয় ৩ হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেয় চায়না এক্সিম ব্যাংক। বাকি অর্থ দেয় বাংলাদেশ সরকার ও ঢাকা ওয়াসা। ঋণের জন্য চীনের এক্সিম ব্যাংককে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে আবার এ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা করা হয়। ঋণের শর্তানুযায়ী চায়নিজ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং প্রকল্পে ব্যবহৃত পাইপ চীন থেকে আমদানির শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়। সরেজমিন যশলদিয়া প্রকল্প এলাকায় দেখা যায়, বন্ধ রয়েছে পানি পরিশোধন প্রকল্প। পদ্মার পানি টেনে পাম্পে নিয়ে যাওয়ার চ্যানেলেও পানি স্থির। পাম্পের পাশের বাসিন্দা নূর মাতবর বলেন, তিন মাস আগে পাম্প একবার চালু করেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে বিকট শব্দে পাইপ ফেটে যায়। সঙ্গে সঙ্গে পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। পাম্প থেকে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের দূরত্ব প্রায় ৪০০ গজ। এর মাঝে বেপারিবাড়ি মোড়ে পাইপ ফেটে পানি উপরে উঠতে থাকে। যশলদিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আক্কাছ মাতবর বলেন, ‘ওয়াসার এ প্রকল্পে যে ভবন বানানো হয়েছে তাও ফেটে গিয়েছিল। মাসদুয়েক আগে সিমেন্ট দিয়ে তা মেরামত করা হয়। এই পাইপ বসানোর জন্য রাস্তা কেটে জনদুর্ভোগ তৈরি করেছে। এখন সে পাইপও ফেটে যাচ্ছে। ’

চুক্তি মোতাবেক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরির কাজে আরসিসি পাইল করার কথা থাকলেও ঠিকাদার এসএফজি পাইল করেছেন। নিম্নমানের পাইলিংয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম দেশের বাইরে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। উপ-প্রকল্প পরিচালক মিহির কুমার দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের অফিস অর্ডার রয়েছে, আমি কোনো রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলতে পারব না। আপনারা প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ’

ম্যাজিক শাড়ি ।। রনি রেজা

প্রচ্ছদ: গীতা বিশ্বাসের চিত্র ব্যবহার করে

বাহ্। দারুণ লাগছে তো! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আনমনেই মৃদু স্বরে বলে ওঠে বিভা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখে নেয় আরেকবার। গোলাকৃতির মুখের সঙ্গে মানিয়ে চুলের সামনের দিক ফাঁপিয়ে নিয়ে ঘাড়ের কাছে খোঁপা করেছে। খোঁপাটা যেন মজবুত হয় এজন্য দুইপাশে দুইটি ফুলওয়ালা ক্লিপ দিয়ে আটকে দিয়েছে।কপালের ওপর দিয়ে স্বর্ণলতার মতো ঝুলে রয়েছে খোপায় স্থান না পাওয়া কয়েক স্টিক চুল। ওরা মুক্তির আনন্দে দোল খাচ্ছে। ওই কয়েক স্টিক চুলই যেন বিভার সৌন্দর্য্য খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভার সৌন্দর্য্য! ভেবে স্মিত হাসে নিজেই। খোঁজে জবাব। বিভার আবার সৌন্দর্য্য আছে নাকি? পুরোটাই তো ওই গাঢ় মেকআপের কারসাজি। মুখে দু’চারটা খুদে দাগ যা ছিল; ঢেকে দিয়েছে কভার স্টিক দিয়ে। এরপর উজ্জ্বল শ্যামলা রঙের ওপর ফাউন্ডেশনের প্রলেপ দিয়ে জ্বলজ্বলে রূপ গড়েছে। এক শেড ডার্ক ফাউন্ডেশন দু’পাশে লাগিয়ে চাপা নাকটি উঁচু করে নিয়েছে। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করে ব্রাউন পিংক শেডের ব্লাশ-অন লাগিয়েছে কানের কাছে। এতে কিছুটা লাজুক ভাব ফুঁটে উঠেছে। সবই কৃত্রিম। তাহলে বিভার থাকলটা কী? এজন্যই সাজের প্রতি বিভার এত অনিহা। 

মৃদুল বিয়োগের পর আর সেভাবে সাজা হয়নি। মৃদুলের কঠিন আবদারের জন্যই সাজতে হতো। তাও মাঝে-মধ্যে। আর সাজতো সেই ছোট বেলায় মায়ের হাতে। মা এক প্রকারের জোর করেই সাজিয়ে দিতেন তখন। মায়ের হাত থেকে ছুট পেয়েই বেণী দুলিয়ে মাঠে ছুটে যেত বিভা। ওই পর্যন্তই। বাড়ির পশ্চিম পাশে বেতঝাঁড়ে ঘেরা মাঠটিতে একবার হাজির হতে পারলেই এক ঝটকায় চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে মেতে উঠত গোল্লাছুট, বউটুবানি, এক্কাদোক্কা খেলায়। পুরো মাঠে বিচরণ করতো ছোট্ট বিভারাণী। আর বিভার পিঠজুড়ে বিচরণ করতো খোলা চুলগুলো। এরপর দীর্ঘদিন বিরতি দিয়ে মৃদুলের আবদারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল সাজবিরোধী বিভারাণীর। মৃদুল প্রায়ই বলতো, ‘সাজলে তোমাকে পরীর মতো লাগবে। মাঝে মধ্যে লুক চেঞ্চেরও দরকার আছে। নিজের জন্য না হোক; আমার জন্য তো একটু সাজতে পার!’ 

বিভার সোজা জবাব, ‘এই আমাকে পারলে ভালবেস। কোনো পরীকে নয়। বিনা সাজে যদি এতই খারাপ লাগে তাহলে তোমার মনের মতো পরীগোছের কাউকে খুঁজে নাও।’ 

অল্পতে রাগতে পারে বিভা। হাসতেও পারে অল্পতে। আবার ভালও বাসতে পারে অল্পে তুষ্ট বিভারাণী। তাই বিভার অল্প কথায়ই শান্ত হতো মৃদুল। বিভাও রেগে বেশিক্ষণ থাকতে পারতো না। এত শান্ত, সব মেনে নেয়া স্বভাবের মানুষের সঙ্গে কি রাগ করা যায়? অবশ্য এ নিয়েও আপত্তি ছিল বিভার। মন খারাপ হতো মাঝে মধ্যেই। একটু ঝগড়াও করার উপায় ছিল না মৃদুলের সঙ্গে। এক আধটু খুনসুটি না হলে কি প্রেম গাঢ় হয়? তিতনি, সায়মা, লাইছাদের কত ঝগড়া হয় ওদের প্রেমিকের সঙ্গে। এমন কোনো দিন নেই ঝগড়া হয় না। আবার পরক্ষণেই মিলে যায়। আরো কোমল হয়ে ওঠে সম্পর্কটা। ঠিক ডাবের পানির মতো টলটলে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে থাকে কত বাড়তি আয়োজন। বাড়তি গিফট, ঘোরাঘুরি, হৃদয় নিংড়ানো কথা চলে অনবরত। শুনে খুব লোভ হতো বিভার। ঝড় পরবর্তী সকাল আর ঝগড়া পরবর্তী সম্পর্ক দুটোই বিভার খুব পছন্দ। একপ্রকারের নরম পরশ পাওয়া যায়। মৃদুল এ বোঝে না। এমনিতে কত রোমান্টিক! মাঝে মধ্যে যে ঝগড়াও কাম্য থাকে; তা কেবল বিভাই বোঝে। মৃদুলকে রাগাতে কত পাগলামোই না করেছে বিভা। উদ্ভট সব আবদার করতো। হুট হাট দেখা করতে চাইত। বলা নেই কওয়া নেই হাজির হতো মৃদুলের অফিসে। এ নিয়ে কলিগদের বক্র হাসিও সহ্য করতে হয়েছে মৃদুলকে। অন্য কোনো পুরুষ হলে হয়ত ব্রেকআপই হয়ে যেত। অথচ সেসবও নির্দ্বিধায় মেনে নিত মৃদুল। পাগলামোর জবাবে বাড়িয়ে দিত ভালবাসা। মিলত আদর। এক জীবনে এত ভালবাসা যায়? মাঝে মধ্যে ভেবে ভেবে চোখে জল চলে আসত বিভার। মৃদুলকে আপন করে পাওয়া সত্যিই সাত জন্মের ভাগ্য। পেছনের সব ভুলে মৃদুলকে ঘিরেই স্বপ্ন সাজাতে থাকে বিভা। কী এক মোহে আটকে যায়। দিন রাত চলে নানা পরিকল্পনা। বিশ্বাস করতে থাকল, ‘মৃদুলই তার পরম সঙ্গী। কখনো হারাবে না।’ অথচ সেই মৃদুলই কী এক সামান্য বিষয়ে অভিমান করে হারিয়ে গেল। মৃদুলকে ধরে রাখতে কিনা করেছে বিভা? অনিহা সত্তে¡ও সাজতো মৃদুলের ইচ্ছেমতো। যখন যেভাবে বলেছে, সেভাবেই মেলে ধরেছে নিজেকে। নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়েছে মৃদুলের চাওয়ামতো। একদিন সকালে হঠাৎ ফোন করে বলল-  ‘বিভা তোমার সেই ম্যাজিক শাড়িটি পড়ে দ্রুত শাহবাগ এসো। নাভীর নিচ থেকে কুচি করে পরবে। লাল টুকটুকে সিফনের শাড়িটি পরলে নিশ্চয়ই অন্যরকম মাদকতা ছড়াবে আমার বিভারাণী। শাড়ির ফাঁক গলে উঁকি দিবে হাল্কা মেদযুক্ত পেট। আহ্ তাতেই কি সুখ!’ পাগল না হলে কেউ এমন কথা বলতে পারে?- ভাবে বিভা। এ শাড়িটিতে বিভার বরাবরই ভীতি রয়েছে। শাড়িটি কেনার পর থেকে সব এলোমেলো চলছে। এ আধুনিক যুগেও কু-সংস্কারে আটকে রেখেছে শাড়িটি। বিজ্ঞান, দর্শন যুক্তি বিভার মাথা থেকে সব কু-সংস্কার ঝেড়ে ফেললেও ম্যাজিক শাড়িটির ক্ষেত্রে সব গুলিয়ে যায়। ভীতি পিছু ছাড়ে না। শাড়িটি কেনা হয়েছিল কয়েক বছর আগে প্রথম প্রেমিক রিয়াদের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশে। দিন-ক্ষণ ঠিক। দীর্ঘদিন পর দেখা হবে রিয়াদের সঙ্গে; তাই প্রস্তুতির কমতি ছিল না। রিয়াদের পছন্দের রঙ লাল। সেই লাল রঙেরই একটি সিফনের শাড়ি কিনল রিয়াদকে চমকে দিতে। অনেক ইচ্ছে ছিল শাড়িটি পরে রিয়াদের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। কিন্তু আচমকাই ব্রেকআপ হয়ে গেল। তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা ছাড়াই সম্পর্কটি ভেঙ্গে গেল। বিষয়টি এতই ঠুনকো যে আজ আর তা মনেও নেই বিভার। এরপর রিয়াদের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণে রাখে শাড়িটি। এর কিছুদিন পর দ্বিতীয়বারের মতো প্রেম হয় রিটন নামে এক ছেলের সঙ্গে। দেখতে হলিউডের নায়কদের মতো। গুণেরও শেষ নেই। বেশ চলছিল। কথাপ্রসঙ্গে একদিন শাড়িটির কথা বলাতেই রোমান্টিক হয়ে ওঠে রিটন। আবদার ওই শাড়ি পরে দেখা করার। কিছুটা অনিহা থাকা সত্ত্বেও রাজি হলো বিভা। কিন্তু কি আশ্চর্য়! এক্ষেত্রেও একই ঘটনা। দেখা করার আগের রাতে বিভার ফোন ওয়েটিং দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল রিটন। কিছু না বলেই ব্রেকআপের ঘোষণা। বিভাকে কিছু বলার সুযোগই দিল না। এরপর যখনই শাড়িটি পরার ইচ্ছে হয়েছে তখনই কোনো না কোনো ঝামেলা হাজির হয়েছে। সব মিলিয়ে শাড়িটির যে জাদুকরি শক্তি রয়েছে তা দৃশ্যমান। এ অবস্থায় কোনো শুভক্ষণে শাড়িটি পরার সাহস নেই বিভার। মৃদুলও এ ঘটনা জানে। তারপরও এমন আবদার যে কেনো করলো কে জানে? ভয় হয় বিভার। মৃদুলের এমন আবদারে কী করবে বুঝতে পারে না। পাগলটাকে বোঝানোর ক্ষমতাও নেই। বোঝাতে গেলে হাজার যুক্তি দাঁড় করাবে অনায়াসেই। মৃদুলের কোনো আবদার কখনো কি ফেলতে পেরেছে? সব মিলিয়ে রাজি হতে হয়। কিন্তু তাৎক্ষণিক দেখা না করে একটু সময় নেয় বিভা। একটা দিনও ঠিক করে নেয়। শঙ্কা ছিল দেখা করার আগেই মৃদুলের সঙ্গে কোনো ঝামেলা না হয়। কিছুটা সতর্কও ছিল। আবার ভরসাও ছিল মৃদুলের ওপর। অন্য দুই প্রেমিকের চেয়ে মৃদুলের প্রতি বিভার আস্থা একটু বেশিই ছিল। বিভার বিশ্বাস ছিল শাড়ির জাদুকরি শক্তিকে এবার হার মানাবে মৃদুলের প্রেম। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনাও করেছে। কিন্তু শেষ অব্দি শাড়িরই জয় হলো। হারিয়ে গেল মৃদুল। 

আজ সেই শাড়িটিই পরেছে বিভা। মৃদুলের পছন্দমতোই নাভীর নিচ থেকে কুচি করে পরেছে। হাল্কা মেদে বেশ আকর্ষণীয় লাগছে। রোমান্টিক হয়ে ওঠে বিভা নিজেই। মুহূর্তেই হামলে পড়ে রাক্ষুসে স্মৃতিগুলো। যেন পাইথনের মতো গিলে খেতে চায়। যুদ্ধক্ষেত্রের বর্শার মতো এসে বিঁধতে থাকে চারিদিক থেকে। ক্ষত বিক্ষত করে দেয় মুহূর্তেই। আয়নার দিকে তাকিয়ে আবার নিজেকে সামলেও নেয়। জীবনের শেষ মুহূর্তে কোনো আবেগ নয়। সুস্থ-স্বাভাবিকভাবেই বিদায় নিতে চায় এ পৃথিবী থেকে। বধূ সাজে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে প্রবেশ করে বাঙালি নারীরা। নতুন জীবন সঙ্গীকে নিয়ে শুরু হয় নতুন পথচলা। বিভাও এক জীবন ত্যাগ করছে। তবে পরের জীবনে কোনো সঙ্গী থাকবে না। অনন্তকাল চলতে হবে একাই। এই জীবনেরই মতো। ভেবে চিন্তেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভা। আজকের মুহূর্তের জন্য করতে হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর পৌঁছতে পেরেছে এ সিদ্ধান্তে। ইন্টারনেট ঘেটে খুঁজেছে আত্মহত্যার ব্যতিক্রম উপায়। বিশ্বের খ্যাতিমানদের আত্মহত্যার কৌশল জেনেছে। কারণ জেনেছে। সব শেষে একটি পন্থা মোটামুটি পছন্দ করেছে। সে অনুযায়ী প্রস্ততিও শেষ।  নিজের সাজ, ঘর গোছানো, রবীন্দ্রসংগীত ডাউনলোড করা, জুসের সঙ্গে বিষ মেশানো; সবই শেষ। এখন শুধু সুইসাইড নোটটি লিখলেই হয়ে যায়। এটা তেমন ঝামেলার কিছু নয়। বিস্তর কিছু লিখতে হবে না। শুধু লিখবে, ‘আমাকে কোনো গোসল দিতে হবে না। সাদা কাফনের কাপড়ও পরাতে হবে না। আমি প্রস্তুত। এভাবেই যেন মাটিচাপা দেয়া হয়। ’ লিখতে আর কতক্ষণ লাগবে? কিন্তু সকালে যখন মানুষের হাতে পড়বে এটি তখন সৃষ্টি হবে মহা ঝামেলা- এটা বিভা জানে। একেকজন এসে দাঁড় করাবে একেক যুক্তি। কেউ কেউ সুযোগ বুঝে ফতোয়া দিয়ে নিজের জ্ঞান জাহিরের চেষ্টা করবে। আবার অনেকে মোবাইল ফোন টিপে টিপে বের করবে পরিচিত অর্ধপরিচিত হুজুরদের মোবাইল নম্বর। জানতে চাইবে মাসআলা। সব শেষে হয়ত সবাই একমত হবে- না; লাশ কোনোভাবেই গোসল ও কাফনের কাপড় ছাড়া দাফনের সুযোগ নেই। এরমধ্য থেকেও কেউ একজন বলে উঠবে, ‘আত্মহত্যা যেহেতু করেছে এমনিতেই জাহান্নামি। একে আর অত নিয়ম মেনে দাফন-কাফনের দরকার কী? শেষ ইচ্ছে যেহেতু লিখে গেছে; ওভাবেই মাটিচাপা দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে ফেল। কেউ খুঁজবে আত্মহত্যার রহস্য। আবার কেউ এসে তো লাশই আটকে দিবে।  বলবে, ‘ময়নাতদন্ত ছাড়া এ লাশ দাফন হবে না।’ পুলিশে খবর দেয়া হবে। আবার আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিকও করা হবে। এরপরও কিছুদিন ধরে চলবে নানা আলোচনা। কেউ বলবে,  ‘হয়ত প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়েছে; তাই আত্মহত্যা। আবার কেউ বলবে, ‘নষ্টামি করে শেষ পর্যন্ত জীবনটাই দিতে হলো।’  চিত্রগুলো বিভা এ জীবনে দেখেছে অনেকবার। যদিও এ নিয়ে বিভার মাথাব্যথা নেই। ইচ্ছে পূরণ হওয়া না হওয়া নিয়েও তেমন চিন্তা নেই। একজন মানুষের জীবনে আর ক’টা ইচ্ছেই বা পূরণ হয়? তবু সুইসাইড নোটটা লিখে যেতে ইচ্ছে হয়। ড্রয়ার খুলে হাতে নেয় দুধসাদা কাগজ। এরইমধ্যে বেঁজে ওঠে কলিংবেল। বার কয়েক ঘাপটি মেরে থাকে বিভা। এ মুহূর্তে কোনোভাবেই দরজা খোলা যাবে না; ভাবে। কিন্তু আগন্তকও নাছোড়বান্দা। কলিংবেল চাপতেই থাকে। রাগ হয় বিভার। কলিংবেলের ক্রিং ক্রিং শব্দ আঘাত করে মস্তিস্কের ভেতর। বিরক্ত হয় বিভা। ভাবে- কোথাকার কোন মূর্খ এসেছে এই অসময়ে? কোনো সুস্থ মানুষ এতবার কলিংবেল চাপে? দাঁতে দাঁত চেপে চুপটি মেরে থাকে তবু। ঘণ্টা পেরিয়ে যায়; তবু কলিংবেল বাজছেই। বেজেই চলছে। দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা…। শেষমেশ রেগে গিয়েই দরজা খোলে বিভা। অবাকও হয়। মৃদুল! নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয় না। 

‘ফোন বন্ধ কেন? আর ভেতরে আছ তবুও এত সময় দরজা খোলোনি কেন? কোনো সাড়াশব্দ নেই।’ বলতে বলতে বিভাকে একপ্রকারের ধাক্কিয়ে ভেতরে ঢোকে মৃদুল। বাঁ হাতের বাহু ধরে কাছে টেনে নেয়। 

‘অপূর্ব সেজেছ তো? আজ তোমার বিয়ে নাকি? তাহলে তো ভালো দিনেই এসেছি। কতদিন বিয়ে খাই না!’ 
উচ্চশব্দে কেঁদে ওঠে বিভা। শক্ত করে জরিয়ে ধরে মৃদুলকে। কাঁদতেই থাকে…। 

‘অ্যাই বিভা! কাঁদছ কেন? কিসের এত কষ্ট তোমার? মনের সব বিষ ঝেড়ে ফেল। আমি আছি বিভা। কেঁদনা প্লিজ।’ বলতে বলতে বিভার ঠোঁট নিজের মুখে পুরে নেয় মৃদুল। শুশেই যেন সমস্ত বিষ উপড়ে ফেলবে এমন। 

এই প্রথম বিভা বুঝতে পারে তার ম্যাজিক শাড়িটি শুধু ভাঙেই না; গড়তেও জানে নতুন করে।

কমলগঞ্জে নতুন উপজেলা শিক্ষা অফিসার সাইফুল ইসলাম তালুকদার

মনিপুরি মুসলিম বিডি : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে নতুন উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে যোগদান করেছেন সাইফুল ইসলাম তালুকদার। তিনি রবিবার ১ সেপ্টেম্বর সকালে যোগদান করেন। সাইফুল ইসলাম সবশের্ষ কর্মস্থল ছিল শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। সেখানে তিনি র্দীঘ দিন উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসাবে কাজ করেন। একজন দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে শিক্ষা বিভাগে তার সুনাম রয়েছে। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা হিসাবে কমলগঞ্জে ২০০৯ সালে কর্মরত ছিলেন। সকালে অফিসে আসলে প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন। বিকালে সরকারী প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতি ও সহকারী সরকারী প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে স্বাগত জানান।

Design a site like this with WordPress.com
Get started