সাহিত্যের সঙ্গে সমাজ গঠনের সম্পর্কও নিবিড়। বাস্তব সমাজের ভঙ্গিমার বিশ্বস্ত প্রতিফলনে আবার সেই বাস্তবসমাজকে সমালোচনার মাধ্যমে সমাজ বদলানোর প্রয়াসের মধ্যে সাহিত্যের সমাজগঠনের অভিপ্রায় ফুটে ওঠে। এই দ্বিমুখী উদ্দেশ্যময়তা কখনো সমান্তরালভাবে কখনো পরস্পর প্রবিষ্টতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। সাহিত্যকর্মী সমাজে হস্তক্ষেপ করেন পরস্পর প্রবিষ্টতার পথেই। রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল, শরৎচন্দ্র এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তারা তাদের বলয়ে থেকে সমাজে হস্তক্ষেপ করেছেন নানান অবয়বে। সাহিত্যে হস্তক্ষেপের মধ্যে সমাজ গঠনের ক্রিয়াশীলতা এবং পরিবর্ধনশীলতার প্রতি একটা সচেতন নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা কাজ করে বলেই এর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্তাও অনায়াসে এসে যায়।
হাজী মো.আব্দুস সামাদ: ৩০ জুলাই ১৯৫২ সনে বাংলাদেশ সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত গ্রাম আদমপুর ইউনিয়নের কান্দি গাঁও গ্রামে মরহুম মো. আব্দুস সহিদ এর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। কমার্স গ্র্যাজুয়েট আব্দুস সামাদ ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় “সোনালী ব্যাংক লি: এ যোগদান করেন। ২০১০ সালে সিনিয়র এক্সকিউটিভ অফিসার হিসাবে কর্মরত অবস্থায় অবসর,গ্রহন করেন। বর্তমানে কান্দগাঁওস্থ নিজ আলয় ” পাঙাল নিবাস ‘ এ অবসর জীবনযাপন করছেন | বাংলাদেশের মণিপুরি সমাজের একজন কবি ও সাহিত্যিক হিসাব পরিচিত লাভ করেন৷ লেখকের প্রথম প্রকাশিত বই – মণিপুরি মুসলমানদের ইতিবৃত্ত (ইতিহাস বই) ।
সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নিবিড় অন্তলোকের উজ্জ্বল অনুসন্ধানে নিয়োোজিত এক বিরল ব্যক্তি হাজী মো. আব্দুস সামাদ। একজন উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরিজীবী হয়েও তিনি সমাজ, সাহিত্য গবেষণার মতো কঠিন কাজে ব্যাপৃত রয়েছে ।
মণিপুরি মুসলিম সমাজের ইতিহাস- ঐতিহ্যকে গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং মৌলিক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণেে তিনি সুধী – পাঠকদের অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছেন৷ সাহিত্য- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একজন সফল সংগঠন ও পৃষ্ঠপোষক হিসাবেও তিনি যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন৷
তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা তার পদচারনায় মুখরিত!
এই গুনী লেখকের – সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, – রফিকুল ইসলাম জসিম
প্রশ্ন : কেমন আছেন?
: মহান আল্লাহ রাব্বুল আ-লামিনের অশেষ মেহেরবানিতে ভালই আছি।
প্রশ্ন : লেখালেখির শুরুটা কিভাবে হলো এবং লেখার বিষয়বস্তু কি ছিল? এখন কি লিখছেন তা যদি বলতেন?
: লেখালেখির শুরু বাল্যকাল থেকেই, কিন্তু তা অনিয়মিত এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক। প্রাতিষ্ঠানিক লেখার শুরু চাকুরী জীবন থেকেই। লেখার বিষয়বস্তু ছিল সামাজিক অনুভূতি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা, কবিতা, ছোট গল্প, ডাইরী ইত্যাদি।। কিন্তু প্রকাশক বা মাধ্যমের অভাবে তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
এখন আত্মজীবনী লেখার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আমার লেখা ইতিহাস গ্রন্থের ইংরেজী অনুবাদ। আর মন চাইলে মাঝেমধ্যে কবিতা আর ছোট ছোট অনুভূতি আর স্মৃতিকথা।
প্রশ্ন : আপনার অপ্রকাশিত লেখা গুলো প্রকাশনার অভাবে অনেকটা হারিয়ে গেছে। এই ব্যাপারে আপনি এখন নতুন কি পদক্ষেপ নিচ্ছেন একটু বলুন?
অযত্ন অবহেলায় অনেক লেখা চিরতরে হারিয়ে গেছে। আমার ফে বু আকাউন্টে কিছু কবিতা সংরক্ষিত ছিল। ভাবছিলাম সেগুলো সংগ্রহ করে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করবো, কিন্তু বিধিবাম গত মাসে আমার ফে, বু হিসাবটি হঠাৎ ব্লক হয়ে যায়। হিসাবটি আর রিকভারী করতে পারিনি। যে গুলো সংগ্রযোগ্য তা দিয়ে একটি বই প্রকাশ করা যায় কিনা ভাবছি।
প্রশ্ন : আপনার আত্নজীবনী বই ও মণিপুরি মুসলমানদের ইতিবৃত্ত ইংরেজি অনুবাদ বইটি বের করতে এত দীর্ঘ সময় নিলেন কেন?
: আমি কিন্তু বেশ কয়েক কালের সাক্ষীগোপাল। সেই পাকিস্থানী আমলে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের উত্থান, এর বিকাশ, দূর্যোগের ঘনঘটা, বিয়োগান্তক ঘটনা, রাজাকারের উত্থান, গনতন্ত্রের কালো অমানিশা, সর্বপরি বঙ্গবন্ধু কন্যা, জননেতৃ শেখ হাসিনার অক্লান্ত শ্রম ইত্যাদি। তাছাড়াও সামাজিক অনেক উত্থানপতন অবলোকন করার সুযোগ আমার হয়েছে। ভেবেছিলাম সেগুলো প্রকাশ করলে আগামী প্রজন্ম উপকৃত হবে। আবার আমার মত গোবেচারীর লেখা কে পড়বে, আদৌ কোন প্রকাশক পাওয়া যাবে কিনা? ইত্যাদি ভাবনা। যাকে বলে হিনোমন্যতা, পিছুটান, দুদুল্যমানতা আমার লেখাকে মন্থর করেছে। “মণিপুরি মুসলমানদের ইতিবৃত্ত” বইয়ের ক্ষেত্রেও একই!
প্রশ্ন: বর্তমানে আপনার সাহিত্য চর্চা কেমন চলছে ? বয়স তো ৬৭ বছর পার হলো, এই দীর্ঘ জীবনের অনুভূতি আমাদের জানাবেন কি ?
: আভিধানিক অর্থে সাহিত্য চর্চা বলতে যা বুঝায়, তার চর্চা খুব একটা নেই বললেই চলে। বার্ধক্য এসেছে, তদুপরি সমাজ, সংসারকে কিছুটা সময় দিতে হয়। ধর্ম কর্মতো আছেই।
ছাত্র জীবনে ছাত্র রাজনীতি করেছি। আমি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আদমপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলাম। তাছাড়াও জীবনের দীর্ঘ একটা সময় ব্যাংকে চাকুরী করেছি। কোথাও কোন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়নি, সর্বক্ষেত্রেই সহযোগিতা ও মূল্যায়ন পেয়েছি। তাই জীবনের অনুভূতি বলতে যা বুঝায় তা সুখকর।
প্রশ্ন : শিল্প- সংস্কৃতিসহ নানা শাখায় পদচারণা আপনার। একাধারে গল্প-ছড়া কবিতা লিখেছে, আবার “মণিপুরি মুসলমানদের ইতিবৃত্ত নামে ইতিহাস গ্রন্থ লেখার আগ্রহ কীভাবে তৈরি হলো?
:আসলে শিকড়ের সন্ধান করতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেল আমার শিকড় একটি মজবুট ভিত্তির উপর দাঁড়ানো। অথচ এ ইতিহাস আমাদের প্রতিবেশী বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এমনকি আজকের মণিপুরি প্রজন্মের কাছে খুব একটা জ্ঞাত নয়। তার কারণ বাংলায় আমাদের কোন ইতিহাস গ্রন্থ না থাকা। তাৎক্ষনিকভাবে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম গ্রন্থ লেখার।
প্রশ্ন : লেখালেখিতে মণিপুরি মুসলিম বা মৈতৈ পাঙানরা কিছুটা উপেক্ষিত এবং অবজ্ঞাত থেকেই গেছে ৷ আপনার লেখা মণিপুরি মুসলমানদের ইতিবৃত্ত বই সম্পর্কে কিছু বলবেন?
: লেখালেখিতে মণিপুরি মুসলমানরা উপেক্ষিত নয়, পশ্চাৎপদ, কিছুটা অনীহা। কারণ ভাষাগত এবং পরিবেশগত প্রতিকুলতা। এ প্রতিকুলতা দূর করা গেলে এবং অভ্যাস গড়ে তুলা হলে অদূর ভবিষ্যতে সাহিত্যমনা স্বজনের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
আমার লেখা “মণিপুরি মুসলমানদের ইতিবৃত্ত” একটি ইতিহাস গ্রন্থ। তবে আমি চেষ্টা করেছি এর ভাষাগত মাধুর্য বিঘ্নিত না ঘটানোর, যাতে শ্রুতিমধুর হয়। কিন্তু তা মূল্যায়নের ভারতো আমার কাছে নয়, পাঠকদের উপর।
প্রশ্ন : ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জায়গায় মণিপুরি মুসলমানদের অবস্থান সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?
ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মণিপুরি মুসলমানদের অবস্থান মূল্যায়ন করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, আমাদের মাতৃভাষা মণিপুরি যা আমাদের first language, parrent language অথচ আমাদের লেখাপড়ার হাতেখড়ি বাংলা ভাষায়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম বাংলায়। অথচ বাংলা আমাদের second language, যার ফলশ্রুতিটে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যম খুব একটা মসৃন নয়।
প্রশ্ন: ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার দিক থেকে মণিপুরি মুসলিম সমাজের বর্তমান বাস্তবতা এবং এর চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
:“দুনিয়ার সমস্ত মানুষ একই বংশোদ্ভুত”-এ মতের উপরই ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম একজোড়া মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তারপরে সেই জোড়া হতে দুনিয়ার সকল মানুষের জন্ম হয়েছে। প্রথম দিক দিয়ে একজোড়া মানুষের সন্তানগণ দীর্ঘকাল পর্যন্ত একই দল ও একই সমাজের অন্তর্ভূক্ত ছিল ; তাদের ভাষাও ছিল এক। কোন প্রকার বিরোধ-বৈষম্য তাদের মধ্যে ছিল না। কিন্তু তাদের সংখ্যা যতই বৃদ্ধি পেতে লাগল ততই তারা পৃথিবীর নানাদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল এবং এ বিস্তৃতির ফলে তারা অতি স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন বংশ, জাতি ও গোত্রে বিভক্ত হয়ে পড়ল। তাদের ভাষা বিভিন্ন হয়ে গেল, পোশাক-পরিচ্ছদের দিক দিয়ে অনেক বৈষম্য ও বৈচিত্র দেখা দিল।
দৈনন্দিন জীবন যাপনের রীতিনীতিও আলাদা হয়ে গেল এবং বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন আবহাওয়ায় তাদের রং, রূপ ও আকার-আকৃতি পর্যন্ত বদলিয়ে গেল। এসব পার্থক্য একেবারেই স্বাভাবিক, বাস্তব দুনিয়ায়ই এটা বর্তমান। আর মণিপুরি সমাজ ব্যবস্থার সৃষ্টিও একই প্রক্রিয়ায়। এটাই বাস্তবতা। কাজেই চলমান সমাজ যাতে আরো সুন্দর হয়, সচল হয় তার জন্য আমাদের সবার কাজ করা উচিত।
প্রশ্ন: যে কোন জাতির উন্নতির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমভাবে এগিয়ে যেতে হয়৷ মণিপুরি মুসলিম সমাজ গঠনে নারীর অংশগ্রহণ অথবা অবদান কতটুকু?
: বিশ্বের বর্তমান জনসখ্যার দিকে তাকালে দেখা যায় মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী, একবিংশ শতাব্দীর নারীরা এগিয়ে এসেছেন সমাজ উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে। সামাজিক নানা বাধাবিপত্তি থাকা সত্ত্বেও ঘড়ে-বাইরে পুরুষের সংগে সমান তালে কাজ করছেন। কৃষি থেকে শিল্পকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আফিস আদালত সব জায়গায় তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন । আর মণিপুরি সমাজও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা আজ গৃহস্থালী কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার চাকুরী ও ব্যবসায় সম্পৃক্ত। বেশ কয়েকজন ডাক্তারতো রয়েছেই তদুপরি কলেজ শিক্ষক এবং পররাষ্ট্র কেডারে চাকরীর উদাহরণও তারা সৃষ্টি করেছেন। অনাদি কাল থেকে মণিপুরি নারীরা বয়ন শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত। তাছাড়াও মণিপুরি মুসলিম নারীরা সংসারের অর্থনীতির চাকাকে সবল রাখতে কুটির শিল্প ও রবিশষ্য আবাদে বিশেষ অবদান রেখে আসছে।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধ কালে আপনার বয়স কত ছিল? কিভাবে দেখেন মুক্তিযুদ্ধকে?
মুক্তিযুদ্ধে মণিপুরি মুসলমানদের ভুমিকাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
: মুক্তিযুদ্ধকালে আমার বয়স ২০ বছর। আমি মুক্তিযুদ্ধ সরাসরি দেখেছি। একজন ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে আমি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ সংঘঠিতও করেছি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গৌরবময় ঘটনা। অথচ আদমপুরের মত প্রায় মুক্তাঞ্চলে (এখানে কোন সেনা কেম্প ছিলনা এ অর্থে) থেকেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারা আমার জীবনের চরম ব্যর্থতা এবং কষ্টের।
বিভিন্ন সময় সংঘঠিত বাংলার জনগনের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে এ দেশের সকল মণিপুরি জনতাও ছিল তাদের সহগামী। ১৯৭১ সালেও ছিলনা তার ব্যত্যয়। আমাদের সমাজে মুক্তিযুদ্ধার যে সংখ্যা রয়েছে তা প্রতিবেশী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তুলনায় কোন অংশে কম নয়। সত্তরের নির্বাচনেও মণিপুরি মুসলমানরা ১০০% ভোট মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি আওয়ামী লীগকেই প্রদান করেছে। তাই এদেশের মণিপুরি মুসলমানরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি।
প্রশ্ন : আপনি কি এমন কোন সমাজের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র ভেদে মানুষে মানুষে কোনরূপ পার্থক্য থাকবে না?
তুমিতো জান আমি ধর্মে বিশ্বাসী। ইসলাম ধর্মের একজন অনুসারী হিসাবে আমরা অন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে কখনো অবজ্ঞা করি না। ইসলাম ধর্মের দিক্ষাই হচ্ছে পরমতসহিষ্ণুতা, অন্যের বিশ্বাসের উপর সম্মান প্রদর্শন করা। যদিও আমরা বিশ্বাস করি ইসলামই আল্লাহ তাআলার একমাত্র মনোনিত ধর্ম। আর জাত, বর্ণ, গোত্র এগুলোতো আল্লাহর সৃষ্ট। আল্লাহ তায়ালাই আমাদেরকে বিভিন্ন সমাজ ও, জাতিতে বিভক্ত করেছেন। যাতে আমরা আমাদের আত্মপরিচয় দিতে পারি। আমার জন্মে আমারতো কোন হাত নেই।
হাঁ আমি সুষণমুক্ত এক সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে ইনসাফ কায়েম থাকবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ বহু জাতি, ধর্ম, বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত এক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ, তবে কি দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সমানধিকার ভোগ করে? আপনি একজন সচেতন সৃজনশীল মানুষ হিসাবে বর্তমান প্রেক্ষাপতে দেশের মণিপুরি জনগোষ্ঠী অধিকন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সার্বিক অবস্থা কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
: বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হচ্ছে বাঙ্গালী। তবে এদেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক জাতি সত্বা রয়েছে, তারা সমস্তিগত ভাবে পশ্চাদপদ। শিক্ষা দীক্ষায়, জীবন যাত্রার মান অর্থাৎ সার্বিক দিক থেকে এরা পশ্চাদপদ, এ অনুধাবন থেকেই সরকার এ অনুন্নত জাতি সত্বার জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। কিন্ত তাও আজ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এদেশের মণিপুরিরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। বেশির ভাগ জনগোষ্ঠী কৃষিজীবি। এদের মধ্যে আজো নেই কোন শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী। আমি বলছিনা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোন লোক নেই। থাকলেও এদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ভূড়িভূড়ি রয়েছে। অর্থাৎ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সার্বিকভাবে পশ্চাদপদ নয়, আর মণিপুরি জনগোষ্ঠী সার্বিকভাবে পশ্চাদপদ।
প্রশ্ন: আপনি বিভিন্ন সময় নানা ধরণের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। সে অভিজ্ঞতার আলোকে একজন কবি, সাহিত্যিক হিসেবে মণিপুরি মুসলিম সমাজের একটা সার্বিক চিত্র তুলে ধরবেন কি ?
:হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। শুধু অংশগ্রহণই নয়, যৌবনে আমি সিলেট স্বারদা স্মৃতি ভবনে মঞ্চস্থ “অন্যন্যা” ও “পাথর বাড়ী” দুইটি নাটকেও অভিনয় করেছি। আর সেটা ছিল স্রেফ বিনোদনের জন্য। আর এখন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি নিজের দায়বদ্ধতা থেকে। যে সমাজে আমি জন্মগ্রহণ করেছি, বড় হয়েছি সে সমাজকে আমার কিছু দেওয়া উচিত এ অনুভূতি থেকে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকি। যেমন এস,কে সিনহার ষড়যন্ত্রকে রূখতে সংবাদ সম্মেলন, ছাত্র জনতার মানব বন্ধনে স্বারকলিপি লিখে দেওয়া ইত্যাদি।
কবি সাহিত্যিক হিসাবে মণিপুরি মুসলমানদের আমার মুল্যায়ন হচ্ছে, এরা খুবই সাহসী, চৌকস, উদ্যমী, সৎ ও ধর্মপ্রাণ জাতি।
প্রশ্ন : মণিপুরি মুসলিম সমাজকে ঘিরে আপনার কোন স্বপ্ন আছে কি? তরুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন?
: মানুষ মননশীল। অন্যান্য প্রাণীদের মত সে শুধু খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে না। বাঁচার জন্য তার মননশীলতার চর্চারও প্রয়োজন।এই মননশীলতার চর্চা করতে গিয়েই সে সৃষ্টি করেছে সাহিত্য ,বিজ্ঞান,শিল্প প্রভৃতি বিষয়।এগুলির কোনটিকেই তার জীবন থেকে বাদ দেওয়া চলে না। তাই মণিপুরি মুসলিম সমাজ ঘিরে আমার স্বপ্ন শুধু বিজ্ঞান নয়, সাহিত্য, শিল্প প্রভৃতি বিষয়ের চর্চাকেও তারা যেন জীবনে গুরুত্ব দেয়। তরুণ প্রজন্মের প্রতিও আমার একই আহ্বান তারা বিজ্ঞান, সাহিত্য শিল্প প্রভৃতির চর্চায় যেন আরো মনোনিবেশ করে।
প্রশ্ন : আপনার জীবনেে বা লেখায় কোনো কবি বা সাহিত্যকের প্রভাব পড়ছে কি? অর্থাৎ কোনো কবি বা সাহিত্যিক থেকে কি কোনো প্রেরণা পেয়েছেন?
:আমার বাল্যকালে আমার গ্রামে আব্দুল বারেক নামে একব্যক্তি ছিল, যিনি অন্ধ কিন্তু খেয়াঘাটের মাঝি, ধলাই নদীর দুই তীরে টানানো রশি ধরে ধরে তিনি নৌকা পারাপার করতেন আর শীতকালে নদীতে বাঁশেরপুল তৈরী করে দিতেন আর নদীর তীরে বসে টোল আদায় করতেন। তিনি ছিলেন চারণকবি, সাহিত্যিক। তিনি আমাদেরকে জমায়েত করে অনর্গল নিজের বানানো গান গাইতেন আর গল্প বলতেন। আমরাও সময় পেলে তার পাশে গিয়ে বসতাম। হয়তো তার কিছুটা প্রভাব আমার উপর পরে থাকতে পারে। তাছারাও কর্মক্ষেত্রে অনেক লেখক, কবিকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি তাদেরও কিছুটা প্রভাব রয়েছে। তদুপরি বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষীদের উৎসাহ, উৎদ্দীপনাতো সব সময়েই রয়েছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের মণিপুরি মুসলমানদের ইতিহাস নিয়ে প্রথম বই আপনিই লিখেছে, জীবনে প্রথম বই ইতিহাস লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন? ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যানেলগুলো কী কী ?
আসলে সময়ই কথা বলে। আমি অনিয়মিত সাহিত্য চর্চা করতাম, আর তা ছিল সখের বসে। আমাদের মত অনিয়মিত লেখকের বই প্রকাশে প্রকাশকদের অনাগ্রহ সবসময়েই ছিল। তার মধ্যে হঠাৎ শিকড়ের সন্ধ্যানে লেগে গেলাম। আর তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে নিজ খরচে বই প্রকাশ। ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ।
প্রশ্ন: চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর আপনি বই প্রকাশ করেছেন, চাকুরীরত অবস্থায় বই প্রকাশ করেননি কেন? ৬৭ বছরের জীবনে প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু কথা বলবেন?
: আমার ইতিহাসের বইটির পান্ডুলিপি প্রায় এক দশক আগে লেখা হয়েছিল।চাকুরীকালীন সময়ে কর্মব্যস্ততার কারনে বই প্রকাশের ব্যাপারে আন্তরিক (serious) হতে পারি নি। তবে অবসরের পর আন্তরিক হয়েছি বলেই বই প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছি।
৬৭ বছরের জীবনে অপ্রাপ্তির চেয়ে প্রাপ্তির ব্যপকতা অনেক বেশী। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মানুষের ভালবাসা। আমার সমাজ, বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অফুরান ভালবাসা দিয়ে আমাকে সিক্ত করেছে।
প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্য চর্চা করে আসছেন। সে আলোকে আপনার এমন কোন স্বপ্ন আছে কি ? যা বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
: আমার একটাই স্বপ্ন, মণিপুরি মুসলমান যুবকরা তাদের সামাজিক অবক্ষয় দূর করার জন্য অস্ত্র হিসাবে কলমকে যেন ব্যবহার করে।
রফিকুল ইসলাম জসিম : আপনাকে ধন্যবাদ।
হাজী মো. আব্দুস সামাদ : আপনাকে ও ধন্যবাদ।